
৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যাঁদেরকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তা ও সার্বভৌম ভূখণ্ডের স্বকীয়তা পুরোপুরি ধ্বংস করতে চেয়েছিল হত্যাকারীরা, তাঁরাই হলেন জাতীয় চার নেতা, পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর তাদেরকে হত্যা করা হয়।
আমার বক্তব্য এ বিষয়ে নয়, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে সোহেল তাজ ও তার বোন শারমিন আহমদকে নিয়ে। ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এ কালজয়ী নেতৃত্বকে স্মরণ করে আলোচনা সভা হত। কিন্তু সোহেল তাজরা এ দুর্দিনে বাঙালি মানসে ধাক্কা দেওয়ার মতো কোনো প্রোগ্রাম করতে পারলেন না।
তিনি ও তার বোন শারমিন আহমদ বার বার বলেন উত্তরাধিকার সূত্রে তারা রাজনীতি করতে আগ্রহী নন। কিন্তু সোহেল তাজ তার পিতার স্রোতধারায় চলেই কিন্তু সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর তার বোন সিমিন হোসেন রিমি তার আসনে শক্তভাবে উত্তরাধিকারের রাজনীতিটা ধরে রেখেছিলেন।
সোহেল তাজ ও তার বোন শারমিন আহমদকে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আরও বেপরোয়াভাবে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনাবিরোধী অবস্থানে দেখা যাচ্ছে। যদিও বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটা অপশক্তি বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় চার নেতাসহ সবার ইতিহাস মুছে দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, অপরদিকে আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু হত্যা-নিপীড়ন অব্যাহত। এসব নিয়ে তাদের নীরবতা পালন করতে দেখা যাচ্ছে। যদিও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিয়ে আমারও অনেক প্রশ্ন আছে।
জোহরা তাজউদ্দীন আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। তাজ উদ্দিন আহমদ বঙ্গবন্ধুর বুকের রক্ত নিজ বুকে লেপন করে মৃত্যুঞ্জয়ী হলেন। কোনো লোভ-লালসা-ক্ষমতার মোহ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। কিন্তু আওয়ামী লীগের অবিনাশী চেতনার বিরুদ্ধে কথা বলেননি। কিন্তু আওয়ামী লীগের রক্তের স্রোতধারা তাদের মধ্যে থাকার পরেও কীভাবে এখন এতটা স্পষ্টবাদী হয়ে উঠলেন। তাদের কালজয়ী পিতা ও মহীয়সী মাতার অবিনাশী আদর্শে এমনটা কখনোই পরিলক্ষিত হয়নি। আপনারা বলতে পারেন আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু , শেখ হাসিনা আপনার পরিবারের প্রতি অবিচার করেছেন। আপনার পিতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তো বেইমানি করে মোস্তাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দেনি, বুকের মধ্যে অবলীলায় বুলেট আলিঙ্গন করে নিয়েছেন। মহীয়সী মাতা জোহরা তাজউদ্দীন অহর্নিশ আওয়ামী লীগের পথ ধরে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
আপনাদের বেলায় ভিন্ন আচরণ কেন? শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে আপনাদের নীরবতা কি কাপুরুষতা ও ভীরুতা নয়? এখন মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতা যখন চরমে, তখন আওয়ামী লীগ নিয়ে আপনাদের অতিভাষণ তাজউদ্দীন আহমদ ও জোহরা তাজউদ্দীনের মহানুভব সত্তার দিকগুলো আপনারা ম্লান করছেন কি না ভেবে দেখবেন?
শারমিন আহমদ বলেছেন, আওয়ামী লীগ কিংবা শেখ হাসিনা পরিবারের কেউ কেউ আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন দলের সংকটাপন্ন অবস্থা দূর করতে আপনারা সহযোগিতার জন্য। সে কথাটিও আপনারা অকপটে গণমাধ্যমের গণমাধ্যমে বলে ফেললেন। এ দুর্দিনে আওয়ামী লীগের পাশে থেকে আওয়ামী লীগের উপকারে আসতে পারলে তো আপনারা তাজউদ্দীন-জোহরা তাজউদ্দিনের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে আমার মতো একজন নগণ্য মানুষ আপনাদের স্যালুট জানাতাম।
সোহেল তাজকে দেখলাম কীসের দাবি নিয়ে এ সংকটকালীন অনির্বাচিত সরকারের যেতে। এ সরকার কি দেশের সামষ্টিক সত্তাকে ধারণ করতে পেরেছে। নাকি তারা একটা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে নেমেছে। এদেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, দেশের রিকশাওয়ালাসহ শ্রমজীবী মানুষরা বলছেন, এদের দিয়ে দেশ চলবে না, রিকশাওয়ালা ও শ্রমজীবী মানুষের মোহভঙ্গ হল, তারা এ সরকারের কাছে কোনো কিছুর প্রত্যাশা নিয়ে যান না, আর আপনি এ অনির্বাচিত সরকারের কাছে দাবি নিয়ে যান। এটা আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষের কাছেও হাস্যকর মনে হয়।
শারমিন আহমদ একাত্তর ও চব্বিশকে এক সমান্তরালে দাড় করাচ্ছেন। কিন্তু যারা আন্দোলন করে আওয়ামী লীগ সরকারকে হঁটিয়েছে, তারা একাত্তর বলতে কিছু নেই বলে মনে করে দেশ চালাচ্ছে। শারমিন আহমদ আপনি তো আর দেশ চালাচ্ছেন না। এখানে জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী-জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হচ্ছে না, পক্ষান্তরে হিন্দিগান ও লুঙ্গি ড্যান্স বাজিয়ে বত্রিশে বঙ্গবন্ধুর প্রতি যে অসম্মান জানানো হয়েছে, তা আপনাদের নজরে আসেনি। মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানীদের যে রাষ্ট্রীয় সম্মান গার্ড অব অনার ছাড়া সমাহিত করা হচ্ছে, তাও আপনাদের নজরে আসে না। মনে হচ্ছে, আমরা সুবিধাবাদিতার কোনো এক চক্রে বিবেকবোধ বিসর্জন দিয়ে সবসময় চক্রাকারে ঘুরি।
আমার শাহ এ এম এস কিবরিয়ার কথা মনে পড়ে। আওয়ামী লীগের জন্য জীবন দিয়ে গেছেন। তার ছেলে রেজা কিবরিয়া মার্কিন মুলুকে বেশ কিছুদিন থেকে পিতার সত্তাকেও ভুলে গেছেন। আপনাদের সত্তাগুলো কি নিখুঁত? পিতার আদর্শিক অবিনাশী চেতনাময় দ্যুতি আপনাদের সত্তাগুলোকে কি আলোকিত করেছে? আমরা কিন্তু ভুলেনি তাঁদের কথা, বুকের কোণে পুষি তাঁদের অবিনাশী চেতনা এবং অহর্নিশ পথ চলি।
(লেখাটা সোহেল তাজের মেইলে পাঠানো হয়েছে দীর্ঘদিন আগে, কোনো উত্তর না পেয়ে প্রকাশ করলাম)
লেখক : সাংবাদিক